শিশুর জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটি সেশনে (০-৫ বছর) শিশুর শারীরিক, মানসিক ও আবেগিক বিকাশে আলাদা যত্নের প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে, সেখানে শিশুদের সঠিক স্বাস্থ্য ও যত্ন সম্পর্কে জানা আরও বেশি জরুরি। এই ব্লগ পোস্টে আমরা সেশন অনুযায়ী শিশুদের স্বাস্থ্য ও যত্নের একটি বিস্তারিত গাইড নিয়ে আলোচনা করব।
স্তন্যপান: জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হজমক্ষমতা উন্নত করে এবং সঠিক বিকাশে সাহায্য করে। ফর্মুলা দুধের চেয়ে বুকের দুধ অনেক বেশি উপকারী।নাভির যত্ন: নাভি শুকানো ও সংক্রমণমুক্ত রাখা খুব জরুরি। নাভি পরিষ্কার ও শুকনো রাখতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রকার তেল বা পাউডার ব্যবহার করা উচিত নয়।ত্বকের যত্ন: নবজাতকের ত্বক খুবই নরম ও সংবেদনশীল হয়। নিয়মিত হালকা গরম জলে নরম কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। ত্বক শুষ্ক রাখতে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।ঘুম: নবজাতকের দৈনিক ১৬-২০ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। নিরাপদ ও আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। চিৎ করে শোয়ানো এবং অতিরিক্ত বালিশ বা কম্বল ব্যবহার করা উচিত নয়।টিকা: জন্মের পরপরই বিসিজি এবং হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়া জরুরি। পরবর্তী টিকাগুলোর সময়সূচী মনে রাখতে হবে এবং সময়মতো টিকা দিতে হবে।নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: জন্মের পর প্রথম কয়েকদিনের মধ্যে এবং তারপর নিয়মিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত।
বুকের দুধের পাশাপাশি পরিপূরক খাবার: ৬ মাস পর থেকে বুকের দুধের পাশাপাশি পরিপূরক খাবার শুরু করতে হবে। প্রথমে নরম ও সহজে হজমযোগ্য খাবার যেমন সবজি ও ফলের পিউরি, সুজি, খিচুড়ি ইত্যাদি দিতে হবে। ধীরে ধীরে খাবারের পরিমাণ ও ঘনত্ব বাড়াতে হবে।বৈচিত্র্যময় খাবার: শিশুকে বিভিন্ন ধরনের খাবার যেমন শস্য, ডাল, সবজি, ফল, মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি দিতে হবে। এতে শিশু প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেলস পাবে।পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা: শিশুকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নিয়মিত স্নান করানো, জামাকাপড় পরিষ্কার রাখা এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস করানো জরুরি।নিরাপত্তা: হামাগুড়ি দেওয়া ও হাঁটা শিখলে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঘরবাড়ি নিরাপদ করতে হবে, ধারালো জিনিসপত্র, বিষাক্ত পদার্থ শিশুর নাগালের বাইরে রাখতে হবে।টিকা: এই সেশনে পেন্টাভ্যালেন্ট, পোলিও, রোটাভাইরাস, নিউমোকোক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (পিসিভি) এবং হাম রুবেলা (এমআর) টিকা সহ অন্যান্য টিকা সময়মতো দিতে হবে।শারীরিক ও মানসিক বিকাশ: শিশুর সাথে খেলাধুলা করা, কথা বলা, গান শোনানো এবং বই পড়ে শোনানো উচিত। এতে শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ দ্রুত হয়।
সুষম খাবার: শিশুকে সুষম খাবার দিতে হবে। খাবারে শস্য, ডাল, সবজি, ফল, মাছ, মাংস, ডিম এবং দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জাঙ্ক ফুড ও চিনি যুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।নিজ হাতে খাওয়া: শিশুকে নিজে হাতে খেতে উৎসাহিত করতে হবে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং খাদ্যাভ্যাস উন্নত হয়।শারীরিক কার্যকলাপ: শিশুকে দৌড়াদৌড়ি, খেলাধুলা এবং অন্যান্য শারীরিক কার্যকলাপে উৎসাহিত করতে হবে। দিনের কিছুটা সময় বাইরে খেলতে দেওয়া উচিত।কথা বলা ও ভাষার বিকাশ: শিশুর সাথে বেশি করে কথা বলতে হবে, গল্প শোনাতে হবে এবং ছড়া শেখাতে হবে। এতে তাদের ভাষার বিকাশ দ্রুত হবে।সামাজিক ও আবেগিক বিকাশ: শিশুকে অন্যান্য শিশুদের সাথে মিশতে দিতে হবে এবং খেলাধুলায় অংশ নিতে উৎসাহিত করতে হবে। তাদের আবেগ বুঝতে সাহায্য করতে হবে এবং ধৈর্য ধরতে শেখাতে হবে।পারিবারিক যত্ন ও নিরাপত্তা: এই সময় শিশুরা খুব কৌতূহলী হয় এবং নানা ধরনের বিপদ ঘটতে পারে। তাই তাদের উপর সবসময় নজর রাখতে হবে এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার: শিশুকে নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার দিতে হবে। সকালে স্বাস্থ্যকর নাস্তা দেওয়া খুব জরুরি। বিদ্যালয়ের টিফিনে স্বাস্থ্যকর খাবার দিতে উৎসাহিত করতে হবে।শিক্ষামূলক খেলাধুলা: শিশুকে শিক্ষামূলক খেলাধুলা ও কার্যকলাপে উৎসাহিত করতে হবে। যেমন পাজল, ছবি আঁকা, গল্প বলা ইত্যাদি। এতে তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ দ্রুত হয়।সামাজিকতা ও বন্ধুত্ব: শিশুকে অন্যান্য শিশুদের সাথে মিশতে এবং বন্ধুত্ব করতে উৎসাহিত করতে হবে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভাগ করে নেওয়ার মনোভাব তৈরি করতে সাহায্য করতে হবে।বিদ্যালয়ের প্রস্তুতি: শিশুকে বিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। তাদের অক্ষর জ্ঞান, সংখ্যা জ্ঞান এবং সাধারণ জ্ঞান দিতে শুরু করতে হবে।নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা: এই বয়সেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং প্রয়োজনীয় টিকা (যেমন বুস্টার ডোজ) দেওয়া জরুরি।দাঁতের যত্ন: শিশুদের দাঁতের যত্ন শুরু করা উচিত। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে এবং মিষ্টি খাবার কম দিতে হবে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: শিশুর বয়স অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। এতে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়।টিকা সময়মতো দেওয়া: জাতীয় টিকাদান কর্মসূচী অনুযায়ী শিশুর সব টিকা সময়মতো দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। টিকা শিশুকে মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করে।পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ: শিশুর চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ঘরবাড়ি, খেলনা এবং শিশুর ব্যবহারের জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।নিরাপদ জল ও স্যানিটেশন: শিশুকে সবসময় পরিষ্কার জল পান করতে দিতে হবে এবং সঠিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে জলবাহিত রোগ খুব সাধারণ, তাই এই বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।পারিবারিক সমর্থন ও স্নেহ: শিশুর মানসিক ও আবেগিক বিকাশে পারিবারিক সমর্থন ও স্নেহ অপরিহার্য। শিশুকে ভালোবাসা ও আদর দিয়ে বড় করতে হবে।চিকিৎসকের পরামর্শ: শিশুর কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং নিজের ইচ্ছামতো চিকিৎসা করা উচিত নয়।
আরও নতুন বিষয় জানার জন্য যুক্ত হয়ে যান আজই। 🙂